ডারউইন, ১৬ অক্টোবর-
বাংলা কিশোর সাহিত্যের সোনালি প্রজন্মের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল আজ। চলে গেলেন জনপ্রিয় রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ ‘তিন গোয়েন্দা’-এর স্রষ্টা, লেখক রকিব হাসান।
যিনি একসময় বাঙালি কিশোরদের জন্য গড়ে তুলেছিলেন বুদ্ধি, বন্ধুত্ব আর রোমাঞ্চে ভরা এক জগৎ—যা হয়ে উঠেছিল আমাদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজ বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস চলাকালীন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর বড় ছেলে রাহিদ হাসান।
১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া রকিব হাসানের শৈশব কেটেছে ফেনীতে। স্কুলজীবন সেখানেই, পরে পড়াশোনা করেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় শুরু হয় ১৯৮৫ সালের আগস্টে, যখন সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় রহস্য উপন্যাস সিরিজ ‘তিন গোয়েন্দা’।
তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, ছোটদের জন্য লেখা এই সিরিজ একদিন হয়ে উঠবে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কিশোর রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ। পরবর্তী চার দশকে লাখো কিশোর-কিশোরী বইয়ের পাতায় ডুবে থেকেছে কিশোর, মুসা ও রবিনের সঙ্গে—রাত জেগে পড়েছে রূপালি মাকড়সা, জলদস্যুর দ্বীপ, রক্তচক্ষু, ঘড়ির গোলমাল কিংবা প্রেতনগরী।
তিন গোয়েন্দা শুধু একটা বইয়ের সিরিজ ছিল না—এটা ছিল বন্ধুত্ব, বুদ্ধিমত্তা আর সাহসের আরেক নাম; ছিল এমন এক কল্পজগত, যেখানে ভয় নয়, ছিল কেবল রোমাঞ্চ আর অনুসন্ধান।
রকিব হাসান শুধু তিন গোয়েন্দার স্রষ্টাই নন, তিনি লিখেছেন জনপ্রিয় রাজু গোয়েন্দা সিরিজ। পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন আরব্য রজনী, ড্রাকুলা, টারজান, সলোমনের গুপ্তধন, ট্রেজার আইল্যান্ড, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলসহ অসংখ্য বিশ্বখ্যাত রোমাঞ্চকর বই।
সেবার সোনালি যুগে কাজী আনোয়ার হোসেন ও শেখ আবদুল হাকিমের পাশাপাশি তিনিও হয়ে উঠেছিলেন বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের এক কিংবদন্তি নাম।
আজ তাঁর বিদায়ে যেন এক যুগের অবসান ঘটল। রহস্য-রোমাঞ্চ ধারার সূচনাকারী সেই প্রজন্মের শেষ আলোকবর্তিকাও নিভে গেল নীরবে।
রকিব হাসানের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে আজ এশার নামাজের পর ঢাকার বাসাবো ফ্লাইওভারের ধারের মহাসড়ক জামে মসজিদে।
ভক্তদের কাছে রকিব হাসান শুধু একজন লেখক নন—তিনি ছিলেন স্বপ্নের কারিগর। যিনি হাজারো শিশু-কিশোরকে উপহার দিয়েছিলেন এমন এক দুনিয়া, যেখানে ভয় ছিল না, ছিল কেবল কৌতূহল, বুদ্ধি আর বন্ধুত্ব।
রকিব হাসান আজ নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি তিন গোয়েন্দা এখনো নিঃশব্দে বলে যায়—“রোমাঞ্চ কখনো মরে না।”