ডারউইন, ২৯ অক্টোবর-
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে এক ধর্মীয় পণ্ডিত যিনি মুফতি মুহিব্বুল্লাহ নামে পরিচিত, তার বিরুদ্ধে অপহরণের নাটক সাজিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি সংগঠনের ওপর দায় চাপানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
গাজীপুরের টঙ্গীর টিঅ্যান্ডটি কলোনি জামে মসজিদের খতিব ৬০ বছর বয়সী মুফতি মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজীর অপহরণের গল্পটি শেষ পর্যন্ত ‘নাটক’ প্রমাণিত হওয়ায় দেশজুড়ে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি নিজেই পরিকল্পনা করে এই ঘটনার নাটক সাজিয়েছিলেন এবং এর পেছনে ইন্টারন্যাশনাল কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছিলেন।
ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রতারণার চেষ্টাই নয়, বরং সমাজে ধর্মীয় বিভাজন ও উত্তেজনা তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ট্র্যাকিং ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দেখা গেছে—অপহরণের দিন সকাল সাতটার দিকে মুফতি মুহিব্বুল্লাহ স্বেচ্ছায় টঙ্গী থেকে বেরিয়ে যান। পরে ট্রেনে করে তিনি পঞ্চগড়ে যান এবং সেখানে নিজেই নিজের পায়ে শিকল লাগিয়ে ‘অপহৃত’ অবস্থার ভান করেন।
ঘটনা যেভাবে শুরু
২২ অক্টোবর সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে—গাজীপুরের টঙ্গীর শিলমুন এলাকায় মুফতি মুহিব্বুল্লাহ নামের এক খতিবকে অপহরণ করা হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানান, ফজরের নামাজে যাওয়ার সময় তাঁকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। খবরটি মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
পরদিন সকালে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় তাঁকে ‘উদ্ধার’ করা হয়। তখন তিনি দাবি করেন,
“অপহরণকারীরা আমাকে চোখ বেঁধে নির্যাতন করেছে। কয়েকদিন ধরে ইসকনের লোকজন আমাকে হুমকি দিচ্ছিল। তাদের ষড়যন্ত্রেই আমাকে তুলে নেওয়া হয়।”
তাঁর এই বক্তব্যের পর বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন ও অনুসারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং ইসকনের বিরুদ্ধে অনলাইনে প্রতিবাদ শুরু হয়।
কী বলেছিলেন মুফতি মুহিব্বুল্লাহ
উদ্ধার হওয়ার পর মুহিব্বুল্লাহ বলেন, “অজ্ঞান করে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চোখে কাপড় বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে। ইসকনের কিছু লোক আগে থেকেই আমাকে হুমকি দিচ্ছিল।”
তবে পুলিশের তদন্তে সেই দাবির কোনো সত্যতা মেলেনি।
তদন্তে যা বেরিয়ে এসেছে
জিএমপির কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন,
“ঘটনাটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে যা তথ্য এসেছে, তা সম্পূর্ণ সাজানো নাটক। তিনি (মুহিব্বুল্লাহ) নিজেই পরিকল্পনা করে গুম হওয়ার ভান করেন।”
পুলিশ বলছে, ওই সময় টঙ্গী এলাকার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মুহিব্বুল্লাহ একাই হেঁটে যাচ্ছেন এবং কোথাও কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা অপহরণকারীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
স্বীকারোক্তি ও প্রতিক্রিয়া
ঘটনার কয়েকদিন পর মুহিব্বুল্লাহ নিজেই ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তায় বলেন,
“আমি আসলে কারও দ্বারা অপহৃত হইনি। নিজের সিদ্ধান্তে পঞ্চগড়ে গিয়েছিলাম। ভুল বুঝাবুঝির জন্য সবাইকে দুঃখিত।”
এই স্বীকারোক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকে এটিকে ‘ধর্মের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন।
ইসকনের বক্তব্য
বাংলাদেশ ইসকনের মুখপাত্র সুব্রত দাস বলেন, “আমাদের সংগঠনকে উদ্দেশ্য করে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তদন্তে সত্য উদ্ঘাটিত হওয়ায় আমরা কৃতজ্ঞ। ধর্মীয় সম্প্রীতির বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার মেনে নেওয়া যায় না। আমরা আশা করি, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কেন এমন করলেন?
পুলিশের ধারণা, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনুসারী বাড়াতে ও আলোচনায় আসতে মুফতি মুহিব্বুল্লাহ এই কাণ্ড ঘটান। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা তথ্য প্রচার ও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির’ অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি
ঘটনার সত্যতা প্রকাশের পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুফতি মুহিব্বুল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচার ও সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অভিযোগে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, “এই ঘটনার মাধ্যমে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, ধর্মীয় সম্প্রীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”
ঘটনার সামাজিক প্রতিক্রিয়া
মুফতি মুহিব্বুল্লাহর ‘অপহরণ নাটক’ শুধু ব্যক্তিগত এক প্রতারণা নয়; এটি দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—অপহরণের অভিযোগ মিথ্যা, আর ইসকনের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা ছিল উদ্দেশ্যমূলক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন—“ধর্মের পোশাক পরে এমন প্রতারণা অত্যন্ত লজ্জাজনক।” কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, “ধর্মীয় নেতৃত্বের এমন ভান ও মিথ্যাচার বিশ্বাসের জায়গাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?”
অন্যদিকে, কিছু অনুসারী এখনো তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন। বলছেন তিনি মানসিক চাপে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—ধর্মীয় দায়িত্বে থাকা কেউ যদি বিশ্বাসের সঙ্গে এমন প্রতারণা করেন, তবে জনমানসে ধর্মীয় নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা টিকে থাকে?