টিকার ডোজ সিরিঞ্জে নেওয়া হচ্ছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা।
ঢাকা: দেশব্যাপী শিশুদের টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) টিকাদান কর্মসূচি শুরু হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও লোকমুখে ছড়াচ্ছে নানা মারাত্মক গুজব। ‘এই টিকা নিলে মেয়েরা ভবিষ্যতে মা হতে পারবে না’, ‘ছেলেশিশুরা পুরুষত্ব হারাবে’, এবং ‘বাংলাদেশ গরিব দেশ বলে গিনিপিগ বানানো হচ্ছে’—এমন সব গুজব ছড়িয়ে পড়ায় অভিভাবকেরা চরম দ্বিধায় পড়েছেন।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), গ্যাভি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) নেতৃত্বে চলা এই ক্যাম্পেইনে ৪ কোটি ৯০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম দেশ হিসেবে এই ক্যাম্পেইন চালু করল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গুজব বাংলাদেশে নতুন নয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাহমিদ আহমেদ অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, “আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন কলেরার টিকা নিয়েও গুজব ছিল, এই টিকা নিলে মেয়েদের আর বাচ্চা হবে না। এগুলো সবই ভুল তথ্য।”

টিকা নেওয়ার সময় পাশে সহপাঠীরা। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঘোষণা: গত ১২ অক্টোবর কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর স্পষ্ট জানান, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরীক্ষিত ও অনুমোদিত এ টিকা নিরাপদ ও কার্যকর। এতে শরিয়ত নিষিদ্ধ কোনো উপকরণ নেই এবং এটি সৌদি হালাল সেন্টারের হালাল সনদপ্রাপ্ত।” টাইফয়েড জ্বর একটি প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ, যা ‘সালমোনেলা টাইফি’ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়। দূষিত পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে এই রোগ ছড়ায়।
ইপিআই উপপরিচালক মো. শাহারিয়ার সাজ্জাদ জানান, ২০২১ সালে দেশে ৪ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে ৮ হাজার জন মারা যায়, যার ৬৮ শতাংশই ছিল শিশু। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাজুল ইসলাম আবদুল বারী বলেন, ওষুধ প্রতিরোধী টাইফয়েড বেড়ে যাওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক এখন অকার্যকর হয়ে পড়ছে। শিশুদের জীবন বাঁচাতে টিকা দেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। শিক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, টিকা নিয়ে অভিভাবকেরা ‘ক্যানসার হবে’ বা ‘করোনার টিকার মতো অ্যালার্জি হবে’—এমন অনেক কথা বলছেন।
বগুড়ার একজন শিক্ষক, লতিফা সুকন্যা, জানান, টিকা নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন করাতে তাঁদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তিনি মনে করেন, গুজব প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক প্রচার আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘গণটিকা থেকে সাবধান’—এমন গুজব ছড়ানোয় একজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পোস্ট ডিলিট করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার ধারাবাহিক প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে বলেও জানিয়েছে ইপিআই।
১৮ অক্টোবর রাত ১২টা পর্যন্ত এই ক্যাম্পেইনে ২ কোটির বেশি শিশু নিবন্ধনের আওতায় আসে এবং ১ কোটি ৪ লাখের বেশি শিশু টিকা নিয়েছে। টিকাদান ক্যাম্পেইন চলবে আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত। টিকাদান শেষে ২০২৬ সাল থেকে এই টিকা ইপিআইতে নিয়মিত টিকা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে।