মিসাইল হামলার শঙ্কা: অবস্থান পরিবর্তন করল ‘বাংলার জয়যাত্রা’
ডারউইন, ০৬ মে: ইরান ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চললেও পারস্য উপসাগরে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য হামলা থেকে বাঁচতে…
ডারউইন, ০৮ মে: রংপুর অঞ্চলে এবার আলুর বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে দাম ধসে পড়া, হিমাগারে সংরক্ষণ সংকট এবং বৈরী আবহাওয়ায় আলু পচে যাওয়ায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে শত শত বস্তা আলু ফেলে দিচ্ছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বর্তমানে পাইকারি বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৯ টাকায়। ফলে প্রতি কেজিতে ৬ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হিমাগার ভাড়া বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয়।
রংপুর কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে অঞ্চলে প্রায় ১৬ লাখ ৫ হাজার ২৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছে। বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় শুধু মূল্যধসের কারণেই কৃষকদের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
গঙ্গাচড়া উপজেলার চেংমারী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, প্রায় ৩০০ শতক জমিতে আলু চাষ করেছিলেন তিনি। মৌসুমের শুরুতে পাইকাররা তিন-চার টাকা কেজি দর প্রস্তাব করায় আলু ঘরে তুলে রাখেন। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে আলুতে পচন ধরে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০ বস্তা আলু ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
একই গ্রামের কৃষক পারভীন আক্তার বলেন, নিজের জমির পাশাপাশি বর্গা ও লিজ নেওয়া জমিসহ প্রায় ৫০০ শতক জমিতে আলু আবাদ করেছিলেন তিনি। গরু বিক্রি করে ও বাকিতে সার-কীটনাশক কিনে চাষ করলেও এখন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বাড়িতে সংরক্ষণ করা প্রায় ২০০ বস্তা আলু টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতায় দ্রুত পচে যাচ্ছে।

বদরগঞ্জ উপজেলার কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, গত বছরও হিমাগারে রাখা ৫০০ বস্তা আলু লোকসানের ভয়ে বের করতে পারেননি। এবারও একই পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন তিনি।
রংপুরের কাউনিয়া, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, পীরগাছা, বদরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার ধারে পচা আলুর স্তূপ পড়ে আছে। কোথাও কোথাও দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, গত এক সপ্তাহেই আলুর দাম মণপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কমেছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। অথচ এক মণ আলু উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা।
পীরগাছা উপজেলার কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১১৫টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ ২৯ হাজার টন। অথচ চলতি মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন আলু। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
মিঠাপুকুরের উত্তমাশা কোল্ড স্টোরেজের স্বত্বাধিকারী ওবায়দুল বুলু বলেন, এক মৌসুমে আলু সংরক্ষণে শুধু বিদ্যুৎ বিলেই দেড় কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে জেনারেটর চালানোর খরচও বহন করতে হয়। গত বছর দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক হিমাগারে রাখা আলু বেরই করেননি।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ মৌসুমে রংপুর থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৩৭১ টন আলু রপ্তানি হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১২৬ টন।
কৃষকদের অভিযোগ, আলু রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো গেলে তারা ন্যায্যমূল্য পেতেন। অনেকেই বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগও তুলেছেন।
মিঠাপুকুর উপজেলার কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আলুর বাজারে অস্থিরতা কাটাতে সরকারকে দ্রুত সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে হবে এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে অনেক কৃষক আলু চাষ ছেড়ে দেবেন।
কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকেরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। ঋণ করে চাষাবাদ করতে গিয়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। তিনি উৎপাদন খরচের সঙ্গে অন্তত ৩৩ শতাংশ মূল্য সহায়তা যুক্ত করে আলুর ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের দাবি জানান।
রংপুরের ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ভারত ও পাকিস্তানে আলুর উৎপাদন খরচ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১০ টাকা হলেও উত্তরবঙ্গে তা ১৫ থেকে ১৬ টাকা। উৎপাদন খরচ কমানো না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় কৃষকেরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাহীন উৎপাদন, সীমিত সংরক্ষণ সুবিধা, রপ্তানিতে স্থবিরতা এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে এবার রংপুর অঞ্চলের আলুচাষিদের জন্য বাম্পার ফলনই যেন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট