অস্ট্রেলিয়ান নিউজ টাইম ডটকম
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী শ্রীশান্ত রায়কে ঘিরে সামাজিক মাধ্যম ও ক্যাম্পাসে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নারী ও ধর্মসম্পর্কিত অবমাননাকর মন্তব্য এবং যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠেছে। ঘটনাটি শুধু ক্যাম্পাসে নয়, গোটা দেশজুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে।
অভিযোগের সূত্রপাত
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে Reddit নামের এক সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে এক আইডি থেকে নারীদের নিয়ে অশালীন ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী মন্তব্য প্রকাশিত হয়। পোস্টে বোরকা ও হিজাব পরিহিত মুসলিম নারীদের নিয়ে কটূক্তি করা হয় এবং কিছু পোস্টে বুয়েটের জীবনের ইঙ্গিতও দেখা যায়।
এই পোস্টগুলো ভাইরাল হতেই সহপাঠীরা ওই আইডির পেছনের ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে দাবি তোলেন। অভিযোগ ওঠে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বুয়েটের ইইই (EEE) বিভাগের শিক্ষার্থী শ্রীশান্ত রায়। যদিও এ পর্যন্ত অভিযোগের ব্যাপারে শ্রীশান্তের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিক্ষোভ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
অভিযোগ ছড়িয়ে পড়তেই ২১ অক্টোবর দিনগত রাতে বুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামেন। তারা ডিন অব স্টুডেন্টস’ ওয়েলফেয়ার (DSW) অফিস ঘেরাও করে অভিযুক্তের দ্রুত শাস্তির দাবি জানান।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে প্রচণ্ড চাপে পড়ে বুয়েট প্রশাসন। তারা ঘটনাটিকে “গুরুতর অপরাধ”হিসেবে উল্লেখ করে শ্রীশান্ত রায়কে সাময়িকভাবে ক্লাস, পরীক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম থেকে বরখাস্ত করে।
এদিকে, ঢাকার চকবাজার থানায় সাইবার সিকিউরিটি আইন, ২০২৫-এর অধীনে মামলা দায়ের হয়।

বলা হচ্ছে এটি শ্রীশান্তের কমেন্ট। যদিও যে কেউ অন্যজনের নামে এইসব প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খুলে পোস্ট-কমেন্ট করতে পারেন। তাই এই আইডি শ্রীশান্তের কি না ফরেনসিক যাচাই করছে পুলিশ।
পরে আদালতের নির্দেশে শ্রীশান্ত রায়কে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।
ধর্ষণ অভিযোগ ও বিভ্রান্তি
কিছু সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী দাবি করেন, শ্রীশান্ত তার এক নারী সহপাঠীকে মদ্যপ অবস্থায় ধর্ষণ করেছেন বলে পোস্টে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আনুষ্ঠানিক মামলায় ধর্ষণ সংক্রান্ত কোনো ধারা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। মামলার মূল অভিযোগ “নারীদের অবমাননা ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” সম্পর্কিত।
একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত প্রমাণ পেয়েছি অনলাইন পোস্টে নারী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অপমান করার বিষয়টি সত্য। যৌন নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত আছে।”
বুয়েট শিক্ষার্থীরা বলেন—“আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কঠোর ও স্বচ্ছ তদন্ত করুক। কোনো অপরাধীর জায়গা বুয়েটে নেই। কিন্তু কারো নামের পাশে অন্যায় কলঙ্কও যেন না লাগে”
বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, যেসব স্ক্রিনশট শ্রীশান্ত রায়ের বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত করে দ্রুতই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।
শ্রীশান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের দুর্বল দিকগুলি
“যৌন হয়রানি” বা “ধর্ষণের” সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে যদিও আনুষ্ঠানিক মামলায় তা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অর্থাৎ, সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে এখনও আইনগতভাবে কার্যকর ফোকাস নেই।
সামাজিক মিডিয়া বা Reddit-ভিত্তিক তথ্য মাঝে মধ্যে যাচাই করা কঠিন—আইডি, পোস্ট, স্ক্রিনশট সবই হতে পারে বিকৃত বা অব্যক্ত প্রমাণ।
এখনও চূড়ান্ত রায় বা আদালতের সিদ্ধান্ত হয়নি; তাই অভিযোগ এখন “অভিযুক্ত পর্যায়ে” রয়েছে, “দোষী” হিসেবে ঘোষণা হয়নি।
সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো —প্রমাণের সত্যতা নিশ্চিত করা।
কোনো স্ক্রিনশট বা অনলাইন পোস্ট আদালতে বৈধ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে হলে তা ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ দ্বারা যাচাই করতে হয়।
ফলে “ফেসবুক পোস্ট বা রেডিট কমেন্ট”-এর ওপর ভিত্তি করে কাউকে দোষী বলা আইনগতভাবে দুর্বল ভিত্তি, যতক্ষণ না তা যাচাই হয়।
সচেতন মহল বলছেন, বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
এক কথায় বলা যায়—“বিচার চাই, কিন্তু তা যেন হয় তথ্য, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, উত্তেজনার নয়।”